চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ৬৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নারী ধর্ষণের ঘটনা ৪০০টি এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এ তথ্য জানিয়েছে।
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যার ৩৭টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৫২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনার মধ্যে ২৪১টি ধর্ষণ এবং ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে। এছাড়া নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ১৯১টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও সেবা প্রদান জোরদারকরণ বিষয়ক অংশীজনদের নিয়ে সংলাপের আয়োজন করে আসক। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
তাহমিনা রহমান জানান, মানব পাচারের ক্ষেত্রেও দেশের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে এ সংক্রান্ত ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিচারাধীন বা তদন্তাধীন মামলা ছিল ৫ হাজার ২৮৪টি।
তিনি বলেন, নারী, শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন সেবা চালু রয়েছে। তবে এসব সেবা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় ভুক্তভোগীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। এতে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সময় ও অর্থ—দুটিই ব্যয় হয়।
সংলাপে অংশ নেওয়া অংশীজনেরা বলেন, নারী ও শিশু সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সহজে সেবা পাওয়ার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষা সেবা সম্পর্কে কম জানেন। ফলে প্রয়োজনের সময় অনেকেই এসব সেবা নিতে পারেন না।
সংলাপে মূল নিবন্ধে জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ২০০৯ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন সংস্থাটির আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ হাজার ২২২ জন সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে এবং ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন।
সংলাপে জানানো হয়, আইনগত সহায়তা পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ। আবেদনকারীদের একাধিক অনুমোদনের ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সরকারি পর্যায়ে অনুমোদনকারী কমিটি নিয়মিত সভা না করায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের ব্যবস্থাও অনেকের জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। অনলাইন আবেদন ও হেল্পলাইন চালু থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেটের সীমিত সুযোগ এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতার ঘাটতির কারণে ডিজিটাল আইনগত সহায়তার ব্যবহার এখনো কম বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়। গ্রামাঞ্চলে সরকারি প্রচার-প্রচারণাও শহরের তুলনায় কম।
ফলে বিনা মূল্যে আইনগত পরামর্শ, আইনজীবী নিয়োগ, মামলা পরিচালনা ও আদালতভিত্তিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে অনেক মানুষ জানেন না। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে সমন্বিত সেবার ঘাটতি
সংলাপে জানানো হয়, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল থাকলেও প্রতিটি কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনসহ সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং পৃথক কাউন্সেলিংয়ের স্থানও পর্যাপ্ত নয়।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজমিন সুলতানা বলেন, নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার লঙ্ঘিত না হওয়াই প্রকৃত সুরক্ষা। তবে অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকার দিতে রাষ্ট্রের কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা কাজ করা সম্ভব নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংলাপে আরও অংশ নেন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাটরিনা কইনিগ, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা আইভি আক্তার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির কো-অর্ডিনেটর ডা. তাইয়েবা সুলতানা এবং নারীপক্ষের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুন্নাহার প্রমুখ।
সংলাপে নারী, শিশু, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সেবা আরও সহজলভ্য ও সমন্বিত করতে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।